দেশের ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হলেও, মামলা ও বিধিমালাগত জটিলতায় প্রক্রিয়াটি বারবার স্থগিত হয়ে গেছে। এতে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ এখন কার্যত ‘নেতৃত্বহীন সংকটে’ পড়েছে।
অচলাবস্থার সূচনা ও প্রশাসক নিয়োগ : গত বছরের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে সদস্যদের একাংশ আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের দাবির মুখে সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করেন।
এরপর ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সরকার বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য মো. হাফিজুর রহমানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়। তবে চারটি রিট মামলার কারণে প্রশাসক নির্বাচন আয়োজন করতে পারেননি। তাঁর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে দেড় মাস প্রশাসকের পদটি শূন্য থাকে। অবশেষে গত সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানকে নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁকেও ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত পর্ষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে।
মামলা ও বিধিমালার জটিলতা : এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন প্রক্রিয়া এখন মূলত আদালত ও বিধিমালার ফাঁদে আটকে আছে। আলাউদ্দিন আল মাসুম নামে এক ব্যবসায়ী নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন। আবদুল্লাহ আল মামুদ সাধারণ সদস্যদের নিবন্ধন ফি ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করেন। মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ পরপর দুই মেয়াদ শেষে এক মেয়াদ বিরতি দেওয়ার বিধান চ্যালেঞ্জ করেন। আর মনজুর আহমেদ মনোনীত পরিচালক নিয়োগ পদ্ধতির বৈধতা নিয়ে রিট করেন। এই চারটি রিটের কারণে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন কার্যত থমকে গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক নেতারা। সহায়ক কমিটির সদস্য আবুল কাশেম হায়দার বলেন, “বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণেই এমন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিধিমালা সংশোধনে অপ্রয়োজনীয় কিছু ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।”
গত মে মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চূড়ান্ত করে, যেখানে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জন্য টানা দুই মেয়াদের সীমা, মনোনীত পরিচালক নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সদস্য নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির মতো বিধান রাখা হয়। এই বিধানগুলোকে কেন্দ্র করেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়।
নির্বাচনের উদ্যোগ ও স্থগিতাদেশের ইতিহাস : গত ১৮ জুন নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করা হয়, যেখানে ৭ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সময় ৪৫ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়। তবে আদালতের রিট মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ও হতাশা : এফবিসিসিআইয়ে নেতৃত্ব না থাকায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা কার্যত ‘কণ্ঠহীন’ অবস্থায় আছেন। দেড় মাস ধরে প্রশাসক না থাকায় মতিঝিলের এফবিসিসিআই ভবনে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি কমে গেছে। সাবেক সহসভাপতি মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, “দেশের ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার মধ্যে আছেন। তাঁদের কথা বলার কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। দ্রুত নির্বাচন না হলে ব্যবসা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে আলোচনায়: যদিও নির্বাচন অনিশ্চিত, তবু পরবর্তী সভাপতি পদে আগ্রহী কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ, সাবেক সহসভাপতি মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ, সাবেক প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী, সাবেক পরিচালক মো. পারভেজ সাজ্জাদ আক্তার, এবং বাংলাদেশ সিএনজি যন্ত্রপাতি আমদানিকারক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন।
সাবেক প্রশাসকের দৃষ্টিভঙ্গি : সদ্য সাবেক প্রশাসক হাফিজুর রহমান বলেন, “রিট মামলা চলমান থাকলেও নির্বাচন আয়োজনের কোনো আইনি বাধা নেই। নতুন প্রশাসক চাইলে নির্বাচন বোর্ড পুনর্গঠন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।” তিনি আরও জানান, “বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের কাজ এখনো চলমান, দ্রুত তা চূড়ান্ত করা গেলে নির্বাচন সম্ভব।”
দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী বাণিজ্য সংগঠনটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ব্যবসায়ী মহলে এখন প্রশ্ন একটাই—বিধিমালা সংশোধন ও মামলা নিষ্পত্তির আগে কি নতুন প্রশাসক নির্বাচন করতে পারবেন? যত দিন এই প্রশ্নের উত্তর মেলে না, তত দিন দেশের ব্যবসায়ীরা থাকবেন নেতৃত্বহীন এক অনিশ্চয়তার ভেতর।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)