দেশের ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হচ্ছে পাঁচ ইসলামি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একীভূতকরণের উদ্যোগ। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, দুর্বল অবস্থায় থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একত্রে “ইউনাইটেড ইসলামিক ব্যাংক” (অথবা ‘সম্মিলিত ইসলামিক ব্যাংক’) নামে নতুন একটি ব্যাংকে রূপ নেবে। কিন্তু ঘোষণার কয়েক মাস পার হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলাফল—গ্রাহকের টাকা ফেরত মিলছে না, নতুন আমানত বন্ধ, কর্মকর্তারা অনিশ্চয়তায়, আর ব্যাংকগুলো গভীর সংকটে।
গ্রাহকের টানাটানি, কর্মকর্তার উদ্বেগ: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা এসব ব্যাংকে এখন এক ভয়াবহ স্থবিরতা বিরাজ করছে। গ্রাহকরা তাদের জমানো টাকা তুলতে না পেরে ব্যাংক শাখাগুলোতে প্রতিদিনই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছেন। কখনো কখনো তা বাগবিতণ্ডা পেরিয়ে হাতাহাতিতেও রূপ নিচ্ছে।
এক আমানতকারী অভিযোগ করে বলেন, “জমানো টাকা যদি প্রয়োজনে তুলতে না পারি, তাহলে ব্যাংকে রাখব কেন? আমার বাবা আইসিইউতে, কিন্তু সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে পেনশনের টাকাটাও তুলতে পারছি না।”
এই হতাশা এখন প্রায় সব শাখাতেই একই রকম। অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা বলছেন, নতুন আমানত না আসায় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল সহায়তা বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা বন্ধ, মার্জার প্রক্রিয়া স্থবির: বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, এই পাঁচ ব্যাংকের তারল্য সংকট এতটাই গভীর যে, সাময়িক সহায়তা দিয়েও স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছিল, কিন্তু তা এখন শেষ।
ব্যাংকের নতুন কোনো তহবিল অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এই ব্যাংকগুলোর অবস্থা বহুদিনের দুরবস্থার ফল। সরকার এখন মার্জারের মাধ্যমে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করতে চায়। তাই আপাতত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন কোনো সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না। মার্জার শেষে নতুন ব্যাংকে তহবিল জোগান দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রথমে এটি সরকারি ব্যাংক হিসেবে চালু করা হবে, পরে ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে। তবে প্রক্রিয়াটি জটিল—জনবল পুনর্বিন্যস্তকরণ, সুশাসন, নতুন গ্রাহক আনা ও সিস্টেম উন্নয়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
ব্যাংক পরিচালকদের দাবি: ‘টাকা নেই, আমানতও আসছে না’ গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, “এখন আদায় হচ্ছে না, নতুন আমানতও আসছে না। এ অবস্থায় গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্যও কষ্টদায়ক বাস্তবতা।”
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যু করলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন প্রতিষ্ঠান চালু করা যেতে পারে।
অন্যদিকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ব্যাংকের আর্থিক সংকট এমন পর্যায়ে যে এখন কর্মীদের বেতনও আমানতকারীদের টাকায় চালাতে হচ্ছে।”
গ্রাহকের হতাশা ও অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা : বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন,
“গ্রাহকদের দুর্ভোগ ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার ফল। একীভূতকরণের ঘোষণায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাই গ্রাহকরা আতঙ্কিত। সরকারের উচিত দ্রুত নতুন ব্যাংক গঠন ও তহবিল নিশ্চয়তার স্পষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা।”
তিনি আরও যোগ করেন, “দীর্ঘসূত্রতা চললে গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে, যা পুরো ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য সময়সূচি: বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “রেজিস্ট্রি ও নতুন প্রশাসক নিয়োগসহ প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় ১৫ দিন লাগতে পারে। এরপর প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বিমা তহবিল থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হতে পারে, যাতে অন্তত সীমিত পরিসরে আমানত ফেরত শুরু করা যায়।
বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক: শেয়ারদরে ধস: মার্জার প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এই ব্যাংকগুলোর শেয়ারদরে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ফলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া মার্জার ঘোষণা বাজারে “নেতিবাচক বার্তা” তৈরি করেছে।
মার্জারের ঘোষণা ছিল ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করার পদক্ষেপ হিসেবে। কিন্তু প্রক্রিয়ার অচলাবস্থায় এখন গ্রাহক, কর্মকর্তা, এমনকি ব্যাংক পরিচালকরাও অনিশ্চয়তার দোলাচলে। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই সংকট ব্যাংক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে—যার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জোনায়েদ মানসুর, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫৬ পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। রেজিস্টার্ড : ২৯২ ভূইয়া পাড়া প্রধান সড়ক, খিলগাঁও, ঢাকা- ১২১৯। সম্পাদকীয়: ০১৭৮৯৪২১৪৪৪, বার্তাকক্ষ : ০১৯১৩৫৫৫৩৭১। ই-মেইল: inextpr@gmail.com , (বিজ্ঞাপন), newsuddokta@gmail.com (বার্তাকক্ষ)